জামাই বউয়ের ব্লাড গ্রুপ এক থাকলে কি বাচ্চা প্রতিবন্ধী হয়
আপনার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং গর্ভাবস্থা সংক্রান্ত একটি সাধারণ ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে সাহায্য করবে। আপনি জানতে চেয়েছেন, “স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এক হলে কি সন্তান প্রতিবন্ধী হয়?”। সরাসরি এবং সহজ ভাষায় উত্তরটি হলো: না, স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এক হলে সন্তানের প্রতিবন্ধী হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। প্রকৃতপক্ষে, রক্তের গ্রুপ নিয়ে গর্ভাবস্থায় যে ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হয়, তা স্বামী-স্ত্রীর রক্ত “এক” না হয়ে বরং “অমিল” হলেই তৈরি হয়
এই নিবন্ধে আমরা রক্তের গ্রুপ, Rh ফ্যাক্টর এবং গর্ভাবস্থায় প্রকৃতপক্ষে কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
রক্তের গ্রুপ এবং Rh ফ্যাক্টর কী?
আমাদের রক্ত প্রধানত চারটি গ্রুপে বিভক্ত: A, B, AB, এবং O। এর পাশাপাশি প্রতিটি রক্তের গ্রুপের সাথে একটি বিশেষ চিহ্ন বা প্রোটিন যুক্ত থাকে, যাকে বলা হয় Rh ফ্যাক্টর। এই প্রোটিনটি লোহিত রক্তকণিকার পৃষ্ঠে উপস্থিত থাকে কি না, তার ওপর ভিত্তি করে রক্তের ধরন “পজিটিভ” বা “নেগেটিভ” হয়
Rh-পজিটিভ: যদি রক্তকণিকার পৃষ্ঠে প্রোটিনটি উপস্থিত থাকে।
Rh-নেগেটিভ: যদি রক্তকণিকার পৃষ্ঠে প্রোটিনটি অনুপস্থিত থাকে।
এই Rh ফ্যাক্টরটি আপনার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের জন্য কোনো সমস্যা তৈরি করে না। কিন্তু যখন একজন Rh-নেগেটিভ মা Rh-পজিটিভ সন্তানের গর্ভধারণ করেন, তখন গর্ভাবস্থায় কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে
প্রকৃত ঝুঁকি: Rh অসামঞ্জস্যতা (Rh Incompatibility)
গর্ভাবস্থায় রক্ত সংক্রান্ত প্রধান ঝুঁকিটি হল Rh অসামঞ্জস্যতা। এটি তখনই ঘটে যখন মায়ের রক্ত Rh-নেগেটিভ এবং বাবার রক্ত Rh-পজিটিভ হয়। এই ক্ষেত্রে সন্তান যদি বাবার কাছ থেকে Rh-পজিটিভ বৈশিষ্ট্যটি পায়, তাহলে মা ও সন্তানের রক্তের মধ্যে Rh অসামঞ্জস্যতা তৈরি হয়
কিভাবে সমস্যা তৈরি হয়?
১. প্রথম গর্ভাবস্থায়: সাধারণত প্রথম গর্ভাবস্থায় এই অসামঞ্জস্যতা তেমন কোনো সমস্যা তৈরি করে না। কারণ গর্ভধারণকালে মা ও সন্তানের রক্ত সাধারণত মিশে না। তবে প্রসবের সময়, অ্যামনিওসেন্টেসিস পরীক্ষার সময় বা গর্ভপাতের মাধ্যমে মায়ের রক্তের সাথে সন্তানের Rh-পজিটিভ রক্ত মিশে যেতে পারে
২. অ্যান্টিবডি তৈরি: মায়ের শরীর যখন প্রথমবার Rh-পজিটিভ রক্তের সংস্পর্শে আসে, তখন তার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একে “বিদেশি” হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ধ্বংস করার জন্য Rh অ্যান্টিবডি তৈরি করে .
৩. পরবর্তী গর্ভাবস্থায় জটিলতা: প্রথম গর্ভাবস্থায় তৈরি হওয়া এই অ্যান্টিবডিগুলো মায়ের রক্তে থেকে যায়। পরবর্তী গর্ভাবস্থায় যদি সন্তান আবারও Rh-পজিটিভ হয়, তাহলে মায়ের তৈরি করা এই অ্যান্টিবডিগুলো প্লাসেন্টা অতিক্রম করে সন্তানের রক্তে প্রবেশ করতে পারে এবং সন্তানের লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করতে শুরু করে। এর ফলে সন্তানের মারাত্মক রক্তস্বল্পতা (হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া), জন্ডিস, মস্তিষ্কের ক্ষতি এমনকি গর্ভে সন্তানের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এই অবস্থাকে Rh ডিজিজ বা নবজাতকের হিমোলাইটিক ডিজিজ বলা হয়
নিচের ছকটি Rh অসামঞ্জস্যতার ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করবে :
| গর্ভবতী মায়ের Rh ফ্যাক্টর | সন্তানের পিতার Rh ফ্যাক্টর | সন্তানের সম্ভাব্য Rh ফ্যাক্টর | ঝুঁকির মাত্রা |
|---|---|---|---|
| Rh-নেগেটিভ | Rh-পজিটিভ | Rh-পজিটিভ (সম্ভাবনা বেশি) | উচ্চ ঝুঁকি (RhIg ইনজেকশন প্রয়োজন) |
| Rh-পজিটিভ | Rh-নেগেটিভ | যে কোনোটি | কোনো ঝুঁকি নেই |
| Rh-নেগেটিভ | Rh-নেগেটিভ | Rh-নেগেটিভ | কোনো ঝুঁকি নেই |
| Rh-পজিটিভ | Rh-পজিটিভ | Rh-পজিটিভ | কোনো ঝুঁকি নেই |
প্রতিরোধের উপায়: Rh ইমিউন গ্লোবুলিন (RhIg)
Rh অসামঞ্জস্যতা প্রতিরোধের একটি সহজ ও কার্যকরী উপায় আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অভাবনীয় সাফল্যের নাম Rh ইমিউন গ্লোবুলিন (RhoGAM) .
কখন দিতে হয়: মায়ের শরীরে Rh অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার আগেই যদি Rh-নেগেটিভ মাকে এই ইনজেকশনটি দেওয়া হয়, তাহলে এটি মায়ের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে Rh-পজিটিভ রক্তের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে বাধা দেয়। সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৮তম সপ্তাহে এবং প্রসবের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শিশু Rh-পজিটিভ হলে এই ইনজেকশনটি দেওয়া হয়। এছাড়া গর্ভপাত বা রক্তক্ষরণজনিত কোনো ঘটনা ঘটলেও এটি দিতে হয়
ABO অসামঞ্জস্যতা
Rh ফ্যাক্টর ছাড়াও, ABO অসামঞ্জস্যতা নামে আরেকটি বিষয় আছে। এটি ঘটে যখন মায়ের রক্তের গ্রুপ O এবং সন্তানের রক্তের গ্রুপ A বা B হয়। মায়ের রক্তে স্বাভাবিকভাবে Anti-A এবং Anti-B অ্যান্টিবডি উপস্থিত থাকায়, সন্তানের রক্তের সাথে সামান্য অমিল হলেও সমস্যা হতে পারে। তবে Rh অসামঞ্জস্যতার তুলনায় এটি অনেক মৃদু এবং সহজে চিকিৎসা যোগ্য। সাধারণত এতে তেমন বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয় না এবং জন্মের পর ফোটোথেরাপির মাধ্যমে সন্তানের জন্ডিস নিয়ন্ত্রণ করা যায় .
উপসংহার
আপনার মূল প্রশ্নে ফিরে আসি। স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ (যেমন: A+, A+ বা B+, B+) এক হলে সন্তানের প্রতিবন্ধী হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বরং যে বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে সেটি হল Rh ফ্যাক্টর। সুতরাং, দম্পতিদের উচিত গর্ভধারণের আগে বা প্রথম তিন মাসে রক্তের Rh ফ্যাক্টর পরীক্ষা করানো। মা যদি Rh-নেগেটিভ হন, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক সন্তান জন্ম দেওয়া সম্ভব। প্রচলিত গুজবে কান না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।





Leave a Comment