রাজধানীর তেজতুরী বাজারের একটি ওষুধের দোকান। সন্ধ্যার দিকে ক্রেতাদের ভিড়ের মধ্যে এক তরুণ লাজুক ভ’ঙ্গিতে ক’নডম চাইলে দোকানি কোনো প্রশ্ন ছাড়াই কাউন্টারের নিচ থেকে একটি প্যাকেট বের করে দেন। মোড়কে লেখা একটি অপরিচিত ব্র্যান্ডের নাম, ভেতরের ক’নড’মে আবার ভিন্ন নাম। তিনটি ক’নড’মের দাম মাত্র ১০ টাকা। ত’রুণটি না জেনেই সেটি কিনে নেন অথচ এই ক’নড’মই তার জন্য বড় ধরনের স্বা’স্থ্যঝুঁ’কির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্যাকেটের গায়ে লেখা নাম ‘ম্যান লাভ’, কিন্তু ভেতরে থাকা ক’নড’মে ছাপা রয়েছে ‘এক্সপ্রেশন’ নাম। বিষয়টি দোকানিকে জানালে তিনি বলেন, এসব দেখি না ভাই। নাম যেটা আছে, সেটাই দিই। জিনিস তো আছেই।
উ’দ্বেগজনক বিষয় হলো, নকল ও মা’নহী’ন ক’নড’মের বিস্তার সবচেয়ে বেশি প্রত্যন্ত ও সীমান্তবর্তী এলাকায়। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজারসহ সীমান্তঘেঁষা এলাকায় এসব ক’নড’ম সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। দোকানিরা জানান, স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী নিয়মিত বিভিন্ন অচেনা ব্র্যান্ডের ক’নড’ম সরবরাহ করেন, যেগুলোর দাম নামী কোম্পানির পণ্যের তুলনায় অনেক কম। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এসব ক’নড’মের চাহিদাও বেশি।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটার সৈকতসংলগ্ন এক দোকানি জানান, পর্যটন মৌসুমে কম দামের ক’নড’ম বেশি বিক্রি হয়। অনেক ক্রেতাই মানের চেয়ে দামের দিকে বেশি নজর দেন। কক্সবাজারের এক ওষুধ ব্যবসায়ী বলেন, এসব সস্তা ক’নড’ম সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারেও যাচ্ছে।
জ’ন্মনি’য়ন্ত্রণ ও যৌ”নবা’হিত রো’গ থেকে সুরক্ষার জন্য ক’নড’ম ব্যবহৃত হলেও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদনহীন এসব কনডমে ‘মাইক্রোলিকেজ’ বা অতিক্ষুদ্র ছিদ্র থাকার আশঙ্কা বেশি। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত গ’র্ভ’ধারণের পাশাপাশি এ”ইচ’আইভি, সি”ফিলিস, গ’নোরিয়া, ক্ল্যা’মাইডিয়া, হে’পাটা’ইটিস বি ও সি–সহ নানা যৌ”নসং”ক্রমিত রো’গ ছড়ানোর ঝুঁ’কি বাড়ে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চ”র্ম ও যৌ’ন রো’গ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সমরেশ চন্দ্র হাজরা বলেন, “মানহীন ও ত্রুটিপূর্ণ কনডমে মাইক্রোলিকেজ থাকা স্বাভাবিক। এতে যৌ’নসং’ক্রমিত রো’গ ও এ’ইচআইভি ছড়ানোর ঝুঁ’কি বাড়ে, পাশাপাশি ব্যবহারকারীর মধ্যে ক’নড’মের ওপর আস্থাও কমে যায়।”
ক’নড’ম একটি মেডিকেল ডিভাইস হিসেবে চিহ্নিত। তাই বাজারজাতের আগে সরকারের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর-এর পরিচালক মো. আকতার হোসেন জানান, বর্তমানে দেশে ২৬টি কোম্পানির ৫৭টি ব্র্যান্ডের ক’নড’ম অনুমোদিত। এর বাইরে অন্য কোনো ক’নড’মের অনুমোদন নেই।
তবে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাজারে প্রায় ১৯০টি ব্র্যান্ডের ক’নড’ম পাওয়া যাচ্ছে, যার মধ্যে অন্তত ১৪০টিই অনুমোদনহীন। এসব ক’নডমে’র কোনো পরীক্ষাই হয়নি এবং অধিদপ্তরের অনুমোদনও নেই।
আকতার হোসেন বলেন, “অনুমোদনের আগে ক’নড’ম পরীক্ষার জন্য আমাদের ল্যাবে জমা দিতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের ফ্রি সেল সার্টিফিকেট দিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক পণ্য এই প্রক্রিয়ার বাইরে বাজারে চলে আসছে।”
কীভাবে ছড়াচ্ছে নকল ক’নড’ম
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পুরোনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ ল্যাটেক্স ও রাবার স্বল্প দামে আমদানি করে দেশে মোড়কজাত করে বাজারে ছাড়ছেন। এসব ক’নড’মে লুব্রিকেন্টের পরিমাণ কম থাকে, রাবারের মানও নিম্নমানের হয়।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত বছর রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকা থেকে বি’পুল পরিমাণ অ’নুমোদনহীন ক’নড’ম উ’দ্ধার করা হয়েছে। তবে জ’নব’ল সং’কটের কারণে সব সময় বাজার নজরদারি করা সম্ভব হয় না।
বাড়ছে যৌ’নসং’ক্রমিত রো’গ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নতুন করে ১ হাজার ৮১৯ জন এ’ইচআ’ইভিতে আ’ক্রান্ত হন, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। শুধু এ’ইচআ’ইভি নয়, অন্যান্য যৌ’নসং’ক্রমিত রো’গের সংখ্যাও বাড়ছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গ’নোরিয়া ও ক্ল্যা’মাইডিয়ার সং’ক্রমণ উ’দ্বেগজনক হারে বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অনিরাপদ যৌ’ন সম্পর্কের পাশাপাশি মানহীন সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের কারণেও এই ঝুঁ’কি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল ও অনুমোদনহীন ক’নড’মের বিরুদ্ধে ক’ঠোর নজরদারি এবং জ’নস’চেতনতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এটি বড় ধরনের জ’নস্বা’স্থ্য সং’কটে রূপ নিতে পারে।





Leave a Comment